পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর, ক্লান্ত মিন্নি !

0

সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক: বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় প্রধান সাক্ষী তারই স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। কিন্তু গতকাল বুধবার আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় তাকে। সাক্ষী থেকে আচমকা আসামি করে মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে রিমান্ড চায় পুলিশ। আবেদনের শুনানির পর আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শুনানির সময় মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। কারণ স্থানীয় এমপির পুত্র অ্যাডভোকেট সুনাম দেবনাথের হুমকির কারণে কেউ তার পক্ষে দাঁড়াতে সাহস পায়নি। এ সময় মিন্নিকে দেখাচ্ছিল ক্লান্ত আর হতাশ। আদালতে দাঁড়িয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে স্বামী হত্যার বিচার চেয়েছেন তিনি।

এদিকে, মিন্নিকে আসামি হিসেবে গ্রেপ্তারের পর রিফাত হত্যার বিচার সঠিক পথে আদৌ এগোবে কিনা তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। সমাজের বিভিন্ন মহলের মানুষের এ সংশয় নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে সংসদীয় কমিটি। মামলার প্রধান সাক্ষী মিন্নিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে গ্রেপ্তারের পেছনে প্রভাবশালী কারো প্ররোচনা রয়েছে কি না, গতকাল বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির বৈঠকে সেই প্রশ্ন তোলেন একজন সংসদ সদস্য। এ নিয়ে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের মোড় পরিবর্তন নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে গতকাল সংসদ ভবনে স্বরাষ্ট্র  মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটির সদস্য জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান প্রসঙ্গটি তোলেন। বৈঠক শেষে পীর ফজলুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘হঠাৎ করে মিন্নিকে গ্রেপ্তার করায় বিভিন্ন আলোচনা উঠেছে। আমি বৈঠকে বলেছি, মিন্নিকে কারো প্ররোচনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, সেই আলোচনাও বিভিন্ন মহলে উঠেছে। এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য জানতে চেয়েছি আমি।’

কমিটির সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রিফাত হত্যার ঘটনায় তদন্ত চলছে। এখনো এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার সময় আসেনি। ভালোভাবে তদন্ত চলছে। অপরাধী যেই হোক তার পরিচয় জনসাধারণের সামনে উন্মুক্ত করা হবে, আইনের মুখোমুখি করা হবে।

এছাড়া মিন্নিকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালীরা যাতে আড়ালে চলে না যায় সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। পাশাপাশি আয়েশাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ সংবেদনশীল আচরণ করার এবং তাঁকে যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হতে না হয় তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে আসক। আসকের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।

মূলত মিন্নিকে আসামি দেখিয়ে গ্রেপ্তারের ঘটনায় স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের বিষয়টি জোরালো হয়ে ওঠে। রিফাত হত্যার পর পরই সোশাল মিডিয়ায় সুনাম দেবনাথের ভাষ্য এবং মিন্নির পাশে আইনজীবীদের না দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে পোস্ট ইত্যাদি জনমনে প্রশ্ন তুলেছে। এ কারণে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেনের কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, নিজের স্বামীর হত্যাকাণ্ডে মিন্নি জড়িত- এ সন্দেহ কেন পুলিশের মধ্যে তৈরি হলো? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে মঙ্গলবার সারা দিন জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। পাশাপাশি যেসব আসামিকে রিমান্ডে আনা হয়েছিল তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা যেসব তথ্য-প্রমাণ পেয়েছি সব কিছু মিলিয়ে তার সংশ্লিষ্টতা প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে।’

গতকাল বিকেল সোয়া ৩টার দিকে পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের কঠোর নজরদারির মধ্য দিয়ে মিন্নিকে বরগুনার বিচারিক হাকিম মো. সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের বাইরে মিন্নির মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত থাকলেও কারো সঙ্গে তাকে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। পরে  রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সনজিব দাস তদন্তকারীর পক্ষে মিন্নির সাত দিনের রিমান্ড চান। তখন মিন্নির পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। এমপিপুত্র সুনাম দেবনাথ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আগেই স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছিলেন, খুনিদের পক্ষে আইনজীবীরা মামলা চালাবেন না।

বিচারক সিরাজুল ইসলাম গাজী কাঠগড়ায় দাঁড়ানো মিন্নির কিছু বলার আছে কি না জানতে চান। তখন ক্লান্ত ও হতাশ মিন্নি আদালতের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। একই সঙ্গে বলেন, ‘আমি আমার স্বামী রিফাত হত্যার বিচার চাই।’

প্রসঙ্গত, আগের দিন মঙ্গলবার সকালে মিন্নিকে তার বাড়ি থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ লাইনে ডেকে আনা হয়। প্রায় ১২ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত ৯টায় তাকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। মিন্নি রিফাত শরীফ হত্যা মামলার ১ নম্বর সাক্ষী।

Share.

About Author

Leave A Reply