শিরোনাম:

রংপুর-৩ প্রয়াত এরশাদের আসনে উপনির্বাচনে যতো জটিলতা!

0

সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক: রংপুর-৩ (সদর) আসনের উপনির্বাচনে দেশের বড় তিনটি রাজনৈতিক দলই প্রার্থী দিচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি দলেই একাধিক ব্যক্তি মনোনয়ন চেয়ে বসায় প্রার্থী বাছাই করা নিয়ে দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব সামনে চলে এসেছে। এ অবস্থায় প্রার্থী চূড়ান্ত করা নিয়ে জটিল সমীকরণের মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপি। তবে গত রাতে এই প্রতিবেদন লেখার সময় জানা গেছে, জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে এস এম ইয়াসিরই এগিয়ে আছেন।

প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া আসনটিতে বেশি জটিলতায় পড়েছে তাঁরই গড়া দল জাতীয় পার্টি। লাঙল প্রতীকের মনোনয়ন নিয়ে জাপার শীর্ষ নেতা জি এম কাদের ও রওশন এরশাদের মধ্যে সমঝোতা না হলে দুই পক্ষই আলাদা প্রার্থী দিতে পারে।

জানা যায়, তিন দল মিলে মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন ২৬ জন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৬ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী আওয়ামী লীগের। জাপার মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা পাঁচজন হলেও জটিলতা বেশি তাদের। বিএনপির প্রার্থিতায় এগিয়ে ছিলেন দলটির রংপুর মহানগর সভাপতি মোজাফফর হোসেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে জটিলতা বেড়েছে বিএনপিতেও। এই আসনে বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোটের ধানের শীষের মনোনয়ন পেতে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন পাঁচজন।

রংপুর-৩ আসনে অতীতে কোনো দলেই এতসংখ্যক মনোনয়নপ্রত্যাশী দেখা যায়নি। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে আসনটি দখলে ছিল জাপার প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের। তাঁর মৃত্যুতে পাল্টে গেছে রাজনীতি, পাল্টেছে প্রার্থীদের মনোভাবও।

গতকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে রংপুর শহরে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কালের কণ্ঠ’র আলাপ হয়। স্থানীয় রাজনীতি বিশ্লেষক, সুধীসমাজ ও সাধারণ ভোটাররা জানায়, রংপুরে সবচেয়ে আবেগের নামটি হলো এরশাদ। জাপা একক প্রার্থী দিতে পারলে লাঙলের জয়ের সম্ভাবনাই বেশি। তবে জাপায় একাধিক প্রার্থী থাকলে আওয়ামী লীগের বিজয়ের সুযোগ তৈরি হবে। আবার লাঙল ও নৌকার মাঝখানে থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারে ধানের শীষও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিন দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন। সবারই প্রত্যাশা দলীয় মনোনয়ন নিয়ে রংপুরে ফেরার। তবে শেষ পর্যন্ত নৌকা, লাঙল আর ধানের শীষ কে পাচ্ছেন তা নিশ্চিত করতে পারছে না কেউ।

রংপুরে আওয়ামী লীগের পক্ষে ‘আর কোনো ছাড় নয়, রংপুর-৩ আসনে নৌকা চাই’ স্লোগান শোনা যাচ্ছে। দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশী ১৬ নেতাই নৌকা প্রতীক পেতে তৎপর। তাঁদের অনুসারীরা ইতিমধ্যে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নৌকা প্রতীকে ভোট চাইছে। যার যার পছন্দের প্রার্থীর যোগ্যতা ও সম্ভাবনা তুলে ধরে হাট-বাজার, পাড়া-মহল্লায় গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ, পথসভা এবং কুশল বিনিময় করছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী সংবাদ প্রকাশকে বলেন, মনোনয়ন পেতে আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। তবে কোনো ধরনের বিরোধ নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাঁকে মনোনয়ন দেবেন আমরা তাঁর পক্ষেই কাজ করব।

মনোনয়নপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত টানা তিনবারের সরকারের আমলে দেশে যে নজিরবিহীন উন্নয়ন হয়েছে, রংপুরবাসী সে উন্নয়নের সমান অংশীদার হতে পারেনি। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে—রংপুর বিভাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রংপুর-৩ আসনে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকা। বিষয়টি এখানকার মানুষও উপলব্ধি করছে। মানুষ এখন আর এরশাদময় আবেগ নয়, উন্নয়ন চাইছে।’

রংপুর শহরে গতকাল রওশন এরশাদের বিপক্ষে ঝাড়ু মিছিল করে জাতীয় মহিলা পার্টির নেতাকর্মীরা। আবার রওশনের পক্ষেও স্থানীয় অনেক নেতার উৎসাহী মনোভাব দেখা গেছে। জাপার নেতাকর্মীরা বলছে, জি এম কাদের ও রওশন এরশাদের মধ্যে সমঝোতা হলে এখানে লাঙলের বিজয় সুনিশ্চিত। সমঝোতা না হলে এ আসনে জাপার একাধিক প্রার্থী লড়াইয়ের মাঠে থাকবেন। সে ক্ষেত্রে আসনটি জাপার হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় তারা দুই শীর্ষ নেতার কোন্দল মিটিয়ে ফেলার আহ্বান জানায়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের রংপুর মহানগর সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ‘মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে তিন দলেই কিছু জটিলতা রয়েছে। জাতীয় পার্টির সমস্যা বেশি। কেননা দলটির ভেতরে-বাইরে হাইকমান্ডের নির্দেশ কেউ মানছে না। দলটির একাধিক প্রার্থী নির্বাচনের লড়াইয়ে থাকলে আসনটি হারাতে পারে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের এবার দারুণ সুযোগ রয়েছে। দলটিও চাচ্ছে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে। বিএনপির খুব বেশি সুযোগ না থাকলেও তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের চাঙ্গা রাখতে।’

আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ জানান, দল থেকে যে ১৬ জন মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন সেগুলো যাচাই-বাছাই হচ্ছে। আগামীকাল (আজ শনিবার) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন গণভবনে মনোনয়ন বোর্ডের সভায় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। আবেদন ফরম সংগ্রহকারীদের মধ্যে রয়েছেন—আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাপরিষদ সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামান, রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিউর রহমান সফি, সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল, জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক রোজী রহমান, মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক রেজাউল ইমলাম মিলন, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মজিদ, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মমতাজ উদ্দীন আহমেদ, মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য মোসাদ্দেক হোসেন বাবলু, জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক তৌহিদুর রহমান টুটুল, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি গোলাম রব্বানী বিপ্লব, মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য দেলোয়ার হোসেন, মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি দিলশাদ ইসলাম প্রমুখ।

জাতীয় পার্টি থেকে ফরম নিয়েছেন পাঁচজন—এরশাদের ভাগ্নি মেহেজেবুন নেসা টুম্পা, এরশাদপুত্র সাদ এরশাদ, জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর, মহানগর জাতীয় পার্টির এস এম ইয়াসির ও জেলা জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুর রাজ্জাক।

বিএনপি থেকে পাঁচজন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে জমাও দিয়েছেন বলে জানান বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আমিনুল ইসলাম। তাঁরা হলেন—রংপুর মহানগর বিএনপির সহসভাপতি কাওছার জামান বাবলা, সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম মিজু, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রইচ আহমেদ, সদ্যপ্রয়াত রংপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি মোজাফফর হোসেনের স্ত্রী সুফিয়া হোসেন ও ২০ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ পিপলস পার্টির সভাপতি রিটা রহমান।

 

Share.

About Author

Leave A Reply