Tags

কোরোনা ভাইরাস থেকে মুক্তির উপায়

0

করোনাদানবের প্রকোপে বেড়ে চলে আক্রান্তের সংখ্যা। দেশে দেশে দীর্ঘতর হয় মৃত্যুর মিছিল। আপাতভাবে চিকিত্সা পরিষেবাকে ভেঙে পড়ার হাত থেকে বাঁচাতে, অর্থাত্ কোনোভাবে একটু সামাল দেওয়ার চেষ্টায় কোনো না কোনো ধরনের লকডাউন অথবা কোয়ারেন্টিনের খোলসে ঢুকে পড়ে প্রায় গোটা দুনিয়া।

কিন্তু সেই সঙ্গে লকডাউনের ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শিকেয় উঠে তাবড় তাবড় অর্থনীতিরই নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়েছে। সেই সঙ্গে কোটি কোটি লোকের কাজ হারানোর ইঙ্গিত স্পষ্ট। শিক্ষাব্যবস্থা মোটামুটি শিকেয় ওঠার উপক্রম। তাই আজ হোক বা কাল, ধীরে ধীরে লকডাউন তুলে ‘স্বাভাবিক’ জীবন-ছন্দে ঢুকতে হবে সব দেশকেই। সে এক ‘নতুন স্বাভাবিক’ মডেল। অনেকটাই অজানা। ক্রমে রূপ নেবে মুখোশে ঢাকা আগামী দিনের সভ্যতার গতিপ্রকৃতি, তার দিনযাপন এবং হয়তো করোনাও হবে সেই জীবনের অনিবার্য সঙ্গী।

আপাতদৃষ্টিতে করোনা থেকে মুক্তির দুটি উপায়। প্রথমত, ‘হার্ড ইমিউনিটি’ গড়ে তোলা। দেশের একটা বড়সড় অংশের জনতার ইমিউনিটি গড়ে না ওঠা পর্যন্ত মহামারি থামে না। সংক্রমণের অন্তর্নিহিত বিজ্ঞান এটাই বলে। মহামারি থামার আগে ঠিক কতজনকে আক্রান্ত হতে হবে তা নির্ভর করে একজন আক্রান্ত গড়ে কতজনকে সংক্রমিত করে সেই ‘সংখ্যার ওপর। এই সংখ্যাটা থেকে ১ বিয়োগ করে বিয়োগফলকে সংখ্যাটা দিয়ে ভাগ করলেই জানা যাবে মহামারি থামাতে ঠিক কত শতাংশ মানুষকে আক্রান্ত হতে হবে। তাই একজন আক্রান্ত গড়ে তিনজনকে সংক্রমিত করলে মোট জনতার দুই-তৃতীয়াংশ আক্রান্ত হবে মহামারি থামার আগে। সংখ্যাটা ২.৫ হলে ৬০ শতাংশকে আক্রান্ত হতে হবে—এই রকম। আসলে একটা দেশের ৬০-৭০ শতাংশ লোকের অসুখটা হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে বাকিদের অন্যদের থেকে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। এখানে অবশ্য ধরা হচ্ছে, কেউ একবার আক্রান্ত হয়ে সেরে উঠলেও তার শরীরে থেকে যাবে অসুখের প্রতিরোধক্ষমতা। তাই বলে সব ভাইরাসের ক্ষেত্রেই যে এমনটা হবে, তা কিন্তু নয়। সাধারণ সর্দি-কাশি তো মানুষের বারবার হয়। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে একবার আক্রান্ত হয়ে সেরে উঠলে কেউ আবার সংক্রমিত হবে না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নয় ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন’ও। আবার ‘হার্ড ইমিউনিটি’ এসে গেলেই যে অসুখটা আর কারো হবে না, তাও নয়। লোকজন আক্রান্ত হবে, এমনকি মারাও যাবে, তবে তার প্রকোপ থাকবে সীমিত। মহামারির রূপ নেবে না তা।

পৃথিবীর নানা দেশে করোনার অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করে কিন্তু দেখা যাচ্ছে, হার্ড ইমিউনিটি এখনো দূর-অস্ত্। অনেক ক্ষেত্রেই বড় শহরগুলোতে ১০ থেকে ২০ শতাংশ মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। যেমন জুনের শেষ সপ্তাহে আমার শহর কলকাতাতেই এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৪ শতাংশ মানুষের শরীরে নাকি এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে করোনার অ্যান্টিবডি। বড় শহরের যোগাযোগ, ঘনবসতি, কিংবা নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনস্রোত আর কর্মকাণ্ডের ফলেই এটা ঘটছে, বলাই বাহুল্য। আবার ছোট শহর কিংবা গ্রামীণ অঞ্চলে এই সংখ্যা অনেক কম হওয়াই স্বাভাবিক। যেমন আমার শহরের আশপাশের জেলাগুলোতেই অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়া লোকের অনুপাত ১ শতাংশের আশপাশে। এটাই হয়তো স্বাভাবিক। লকডাউন করে দরজা-জানালা আটকে বসে থেকে দুনিয়া তো সংক্রমণ আটকাতেই চেয়েছে।

তাহলে করোনার মতো অতিমারির হাত থেকে বাঁচার একটাই উপায় থাকে, তা হলো অসুখটার ওষুধ বা প্রতিষেধক তৈরি করা। ভ্যাকসিন তৈরির অভীক্ষায় প্রবল উদ্যোগে নেমে পড়েছে দেশ-বিদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল কম্পানি আর সরকারি-বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো, সে তো আমরা জানিই। ওষুধ তৈরির চেষ্টায়ও কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে প্রাণপাত চলেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

কিন্তু সত্যি বলতে কী, এ ধরনের প্রতিষেধক কিংবা ওষুধ চট করে আবিষ্কার করা একেবারে অবাস্তব। এর প্রস্তুতিপর্বে বিভিন্ন স্তরে প্রটোকল মেনে মানুষের ওপর পরীক্ষা করে দেখতে হয়। একে বলে ‘ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল’। এর চারটি পর্যায়। ওষুধ তৈরির আগে অবশ্য দরকার প্রথম তিনটি পর্যায়ের পরীক্ষা। প্রথম পর্যায়ে ওষুধের কার্যকারিতা দেখাই হয় না। দেখা হয় শুধু ওষুধটির কোনো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি না। স্বাভাবিক কারণেই এ পর্যায়ে কোনো রোগীর প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কিছু সুস্থ মানুষের। যারা সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা জেনেও রাজি হবেন ওষুধটির নানা ‘ডোজ’ বা ‘মাত্রা’ শরীরে নিতে। এদের ওপরে পরীক্ষা করে দেখা হয়, ওষুধটির কোন কোন ডোজ খুব বেশি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটাবে না। সেই সব ডোজকে নেওয়া হয় দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার জন্য। এবার দরকার সত্যিকারের রোগী। কারণ এ পর্যায়ে ওষুধের কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দুই-ই দেখা হয়। গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না থাকলে এবং প্রাথমিকভাবে কার্যকর মনে হলেই ওষুধটিকে নেওয়া হয় তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার জন্য। তৃতীয় পর্যায়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা হয় না, দেখা হয় শুধু কার্যকারিতা। তুলনা করা হয়, একই অসুখের অন্য কোনো প্রচলিত ওষুধের কার্যকারিতার সঙ্গে। অবশ্য করোনার মতো নতুন অসুখের তো আর প্রচলিত ওষুধ থাকবে না। সে ক্ষেত্রে একই রকমের দেখতে চিনি বা অন্য কোনো কার্যক্ষমতাহীন জিনিসে তৈরি কোনো ট্যাবলেট বা ওষুধ দেওয়া হয় কিছু রোগীকে, যাকে বলে ‘প্লেসেবো’। সেই সঙ্গে কিছু রোগীকে দেওয়া হয় সত্যিকারের ওষুধ। তারপর সম্ভাবনাপূর্ণ নতুন ওষুধে রোগীদের পরিণতির সঙ্গে তুলনা করা হয় পুরনো ওষুধ কিংবা প্লেসেবোর ফলাফলের। কোন রোগীকে নতুন ওষুধ দেওয়া হলো আর কাকে দেওয়া হলো পুরনো ওষুধ কিংবা প্লেসেবো, তা কিন্তু রোগীকে জানানো হবে না। জানানো হবে না ডাক্তারকেও। জানলেই তার প্রভাব পড়তে পারে ফলাফলে। কোন রোগীকে কোন ওষুধ নতুন না পুরনো দেওয়া হবে তাও ঠিক করা হয় রীতিমতো লটারি করে। একে বলা হয় ‘র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড ট্রায়াল’। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের এই তিনটি পর্যায়ের শেষে যদি দেখা যায় ওষুধটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া লাগামছাড়া নয়, আর সেই সঙ্গে পুরনো ওষুধের বা প্লেসেবোর তুলনায় সংশ্লিষ্ট অসুখে এই নতুন ওষুধটি কাজ করছে ভালোই, তাহলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সব তথ্য একত্র করে রিপোর্ট পাঠাতে হবে সংশ্লিষ্ট দেশের চিকিৎসাসংক্রান্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে। সব তথ্য পর্যালোচনা করে সেই সংস্থা যদি ওষুধটিকে নিরাপদ ও কার্যকর মনে করে, তারা তখন ওষুধটির বাণিজ্যিকীকরণের অনুমতি দেবে। তবেই ওষুধটির বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন বা সাধারণ রোগীদের দেওয়া সম্ভব।

তাই ভ্যাকসিন কিংবা ওষুধ যে অদূর ভবিষ্যতে আসবে, এটা এক প্রকার আশাই। কিন্তু এতটা দীর্ঘ সময় তো লকডাউনে দেশকে মুড়ে রাখতে পারবে না কোনো দেশই। স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড শুরু হবে একটু একটু করে। মুক্তির উপায় তাই আপাতত একটাই। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং। সাবান, স্যানিটাইজার, মাস্ককে জীবনের অনিবার্য অঙ্গ করে মুখোশে ঢাকা সভ্যতায় মানুষ এড়িয়ে চলবে অন্য মানুষের স্পর্শ—এই দুঃখজনক পরিণতিকে অনিবার্য মেনে নিয়েই বোধকরি আমাদের বেঁচে থাকতে হবে আগামী বেশ কিছু দিন। সেটা কত দিন, তা নির্ভর করবে ওষুধ কিংবা প্রতিষেধক তৈরিতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে লড়তে থাকা বিজ্ঞানীদের সাফল্যের ওপর।

Share.

About Author

Leave A Reply