Tags

মহাররমের ইতিহাস ও তাতপর্য

0

সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক: মুফতী তারিক জামিল: মহাররম ও আশুরার প্রকৃত ইতিহাস ও তাতপর্য , 

সময় তার নিজের গতিতে বয়ে যায়, সব কিছু শুরু হয় এবং শেষ হয়ে যায়। দিন যায় রাত আসে,রাত যায় দিন আসে ,এভাবে শেষ হয় সপ্তাহ,পক্ষ,মাস ও বছর, এ সময় ও কালের প্রবাহ কখনো থামেনা । আপন গতিতে চলে যায় ,সম্মুখ পানে অবিরাম, সদা সচল সময়ের স্রোতধারা।

বর্তমান বিলীন হয়ে যায় অতীতের বুকে ভবিস্যৎ ঠাইঁ পায় বর্তমানের প্রাঙ্গনে । আগমন ঘটে নতুনের প্রস্থান ঘটে পুরানের, জগতে এটা চরম সত্য ,জাগতিক এই নিয়মেই আমাদের সকলের জীবন থেকে চলে যায় একটি বছর।আর কালের রঙ্গীন পাখার ওপর ভর করে আবারো আমাদের দ্বার প্রান্তে উপনীত হয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনা স্বারক, মহিমান্বিত মাস মুহাররম । শুরু হলো একটি নতুন বছর ,অর্থাৎ আরবি বা হিজরী বর্ষ অসংখ্য  ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি বিজড়িত মাস এই পবিত্র মুহাররম ।

মুহাররম আরবী শব্দ যার আভিধানিক অর্থ: সম্মানীত বাস্তব অর্থেও এমাস প্রতিটি মুমিনের দৃষ্টিতে তো সম্মানিত বটেই কাফের মুশরিকদের কাছেও সম্মানিত।তাইতো সেই বর্বর কুরাইশরা পর্যন্ত,এ মাসে সকল প্রকার যুদ্ধ বিগ্রহ হতে বিরত থাকতো।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোন থেকে ও মুহাররমের তাৎপর্য  ও গুরুত্ব অপরিসিম। এ মাসের দশ তারিখে পৃথিবীর ইতিহাসের বহু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘঠিত হয়েছে, তাই ইসলামী ইতিহাসের এই দিবসটিকে আশুরা দিবস নামে নাম করন করা হয়েছে ।এই দিবসটি মহিমান্বিত ও অত্যান্ত পূন্যময়। গুরুত্বপুর্ন ও তাৎপর্য বহুল কেননা  মুহাররমের ইতিহাস এই পৃথিবী সৃষ্টির ইতিহাস কলম সৃষ্টির ইতিহাস।

আমাদের আদি পিতা হযরত আদম আ: কে সৃষ্টির ইতিহাস এবং দীর্ঘদীন প্রভুর দরবারে ক্রন্দন করার পর তওবা কবুল করার পর বিবি হাওয়া আ: এর সাথে পুনরায় পৃথিবীতে  সাক্ষাতের ইতিহাস । নূহ আ: এর ইরাকের জুদি নামক পাহাড়ে এসে অবতরনের ইতিহাস। হযরত ইব্রাহীম আ: কে সৃষ্টি করা ও কুখ্যাত নমরুদের জলন্ত অগ্নিকুন্ড থেকে মুক্তির ইতিহাস। হযরত আইয়্যুব আ: এর কুষ্টরোগ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার ইতিহাস। ইউসুফ আ: কে ফিরে পাওয়ার ইতিহাস। দাউদ আ: এর গুনাহ মাফ ও সুলাইমান আ: এর রাজত্ব পুনরায় ফিরে পাওয়ার ইতিহাস। হযরত ইউনুস আ: এর মাছের পেট থেকে মুক্তি লাভের ইতিহাস। মুহাররমের ইতিহাস তো মুসা আ: এর তুর পর্বতে আল্লাহর সাথে কথা বলা এবং তাওরাত লাভের  ইতিহাস। ফিরাউনের দলবল সহ কুলযুম সাগরে ডুবে মরার ইতিহাস । হযরত ঈসা আ: পৃথিবীতে আগমন ও পূনরায় আকাশে উঠিয়ে নেওয়ার ইতিহাস । জিব্রাঈল আ: আল্লাহর রহমত নিয়ে রাসুল সা: এর নিকট সর্ব প্রথম উপস্থিত হওয়ার ইতিহাস। এবং সর্বশেষ মহাপ্রলয় কিয়ামত দিবস ও সংঘটিত হবে এই মুহাররম মাসের দশ তারিখ তথা আশুরার দিনেই । মোট কথা এদিনে  এতো আধিক পরিমান ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে যা চিরদিন মানুষের কাছে স্বরনীয়  হয়ে থাকবে । বাস্তাবিক পক্ষে মুহাররম মাস একদিকে যেমন মহান আল্লাহর  অসংখ্য নিয়ামতে ভরপুর একটি মাস ,ঠিক তেমনি ভাবে এটা কিন্তু শোকের ছায়ায় বিষাদময় একটি মাসও বটে। কেননা এমাসের দশ তারিখেই  ৬১ হিজরীতে ইরাকের কারবালা উপকন্ঠে সংঘঠিত হয়েছিলো মহানবী (সা:)এর দৈহিত্র হযরত ইমাম হুসা্ইন রা: কে শহীদ করার মত হৃদয়বিদারক মর্মান্তিক ও বিয়োগান্ত ঘটে এই মুহাররম মাসেই।

আশুরার ফযীলত:                                                                                                                                                        আশুরার ফযীলত বর্ননা করতে গিয়ে রাসুল সা: বলেন আমি আশাবাদী যে আশুরার রোযার উসিলায় আল্লাহ তায়ালা আতিতের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দিবেন। রাসুল সা: আরো বলেন আশুরার দিন রোযা রাখা আদম আ: ও অন্যান্য নবীগনের উপর ফরজ ছিলো । এই দিনে প্রায় দুই হাজার নবী জন্ম গ্রহন করেন,এবং দুই হাজার নবীর দুআ কবুল করা হয় ।নবী সা: আরো এরশাদ করেন : হে লোক সকল আপনারা আশুরার দিনে নিজ পরিবারের জন্য ভালো থাবারের ব্যবস্থা করবে আল্লাহ তায়ালা সারা বছর তাকে প্রশস্ততা দান করবেন।

হযরত হাফসা রা: বর্ননা করেন : চারটি আমল এমন যা রাসুল সা; কখোনোই বর্জন করতেন না বরং নিয়মিত পালন করতেন,১। আশুরার রোজা ২। যিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের রোযা ৩। প্রতি মাসের তিনটি রোযা ৪। ফজরের পূর্বে দুই রাকাত নামাজ (নাইলুল আওতার ইমাম শাওকানী হাদিস ১৭১১) আর আশুরার রোযা কয়টি ? এর জবাবে বলতে পারি আশুরার সুন্নত রোযা দুটি  ‍মুহাররমের নয় ও দশ কিংবা দশ ও এগারো তারিখ, (দরসে তিরমিযি ৫৯১)

কিন্তু অত্যান্ত পরিতাপের সাথে বলতে হচ্ছে যে আজকে আমরা আশুরার প্রকৃত ইতিহাস ও আমল থেকে দুরে সরে গেছি ,যার ফলে আমরা লিপ্ত হয়ে পড়েছি বিভিন্ন কু সংস্কারে ।

উপরের আলোচনা দ্বারা এটা সুস্পষ্ট  হয়ে যায় যে আশুরা মাত্র হুসাইন রা: এর শাহাদাত বরনের জন্য বিখ্যাত এবং তাৎপর্যপূর্ন নয় বরং আরো বহু আগে থেকেই ফযীলত পূর্ন । তাই আমি বলবো : নি:সন্দেহে কারবালা ট্রাজেডী আমাদের জন্য তথা গোটা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক চরম বেদনা দায়ক মর্মস্পর্শী উপাখ্যান। কিন্তু তাই বলে এ ক্ষেত্রে আমাদের এতো বেশি সীমালংঘন ও অতিরঞ্জন করা উচিৎ নয়। যাতে শিরক বিদআতে লিপ্ত হতে হয় । যাতে প্রকৃত ইতিহাসের বিকৃতি ঘটে অথচ মিডিয়া এবং নিউজ পেপার হাইলাইটের কারনে মনে হয় যেন এই আশুরা শুধু কারবালা প্রান্তরে ।

মনে করা হয় হুসাইন রা: এর শাহাদাতের ঘটনাই ঘটেছে আর কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বা তাৎপর্য নেই,যা বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ন বিপরীত । কারন কারবালার  ঘটনা সংঘঠিত হয়েছে ৬১ হিজরীতে অথচ রাসুল সা: এর মর্যাদা ও তাৎপর্য ঘোষনা করেছেন সেই দশম হিজরীতে । তাই প্রসঙ্গত এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন ধূর্ত ও ভন্ড  শিয়াদের মাতম মিছিলে প্রভাবিত হয়ে অনেক মুসলমান ও মনে করে থাকেন আশুরার মর্যাদা বুঝি হযরত হুসাইন রা: এর শাহাদাতের কারনেই। অথচ প্রকৃত মর্ম হলো হযরত হুসাইন রা: এর সৌভাগ্য এটা যে তিনি রাসুল সা: এর ভাষায় প্রশংসিত তার আমলের নূরময় আলোর উদ্ভাসিত এই দিনটিতে শাহাদাত বরন করেছেন।

অতএব প্রিয় নবীজীর উম্মত হিসেবে আমাদের কর্তব্য হবে মাতমী বিলাপ সভ্যতা ও হালুয়া রুটির অসার সংস্কৃতিকে সযত্নে পরিহার করে বিগত বছরের পাপ পংকিলতা থেকে পবিত্র হয়ে উঠার জ্যোতির্ময় প্রত্যাসায় নবীজী সা: এর নির্দেশিত রোযা পালনের মাধ্যমে এই দিনের সূফল লাভ করা । আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দান করুন ,আমিন।

 

Share.

About Author

Leave A Reply